সংকট কাটিয়ে গতি ফিরেছে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের বৈশ্বিক বাজারে

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে ফের গতি ফিরেছে বিশ্বজুড়ে বড় ব্যবসায়িক চুক্তি বা একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের (এমঅ্যান্ডএ) বাজারে।

কয়েক সপ্তাহের তীব্র মন্থরগতি কাটিয়ে বড় অংকের লেনদেনে ঝুঁকছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি এবং সক্ষমতা বাড়াতে বড় ধরনের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের পথে হাঁটছেন বিনিয়োগকারীরা। খবর রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয় মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে। তখন বিশ্ববাজারে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, ওই সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী ঘোষিত এমঅ্যান্ডএ চুক্তির মূল্য নেমে আসে মাত্র ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে। গত বছরের এপ্রিলে ঘোষিত মার্কিন শুল্কনীতির পর এটিই ছিল কোনো একক সপ্তাহে চুক্তির সর্বনিম্ন স্তর।

তবে দুরবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী চার সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী এমঅ্যান্ডএর সাপ্তাহিক গড় মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর আগে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে তা ছিল ৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বর্তমানে লেনদেনের গতি বেড়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুনরুদ্ধারের মূলে রয়েছে বেশকিছু মেগা-ট্রানজেকশন বা বিশাল অংকের চুক্তি। এলএসইজি জানিয়েছে, ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তথাকথিত ‘মেগাডিল’ বা বৃহৎ চুক্তিতে সম্মত হওয়ার সংখ্যা তিন মাসে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও সফটওয়্যার খাতের দরপতনকে উপেক্ষা করেই বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইউনিলিভারের খাদ্য বিভাগ ও ম্যাককরমিকের একীভূত হওয়া, খাদ্য পরিবেশক কোম্পানি সিসকোর ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পাইকারি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান জেট্রো রেস্টুরেন্ট ডিপো কিনে নেয়া, এআই তৈরি ওষুধ বাজারজাতে ইনসিলিকোর সঙ্গে এলি লিলির ২৭৫ কোটি ডলারের চুক্তি এবং গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনারস ও ইকিউটির ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এইএস অধিগ্রহণ।

সিটি গ্রুপের বৈশ্বিক এমঅ্যান্ডএ প্রধান গুইলারমো বেগুয়াল বলেন, ‘সিইওদের আত্মবিশ্বাস কিছুটা কমলেও করপোরেট লেনদেনের যৌক্তিকতা অপরিবর্তিত রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধি, খরচ কমানো ও মূলধনী ব্যয়ের সংস্থান করতে বড় মাপের প্রবৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।’"

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাজার। চলতি বছর অঞ্চলটিতে কোম্পানিগুলোর এমঅ্যান্ডএ ভ্যালু গত বছরের তুলনায় ৬৫ শতাংশ কমে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ৭০টি চুক্তি হলেও মার্চে তা কমে মাত্র ৩৭টিতে নেমে আসে, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

গোল্ডম্যান স্যাকসের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের এমঅ্যান্ডএ প্রধান নিমেশ খিরোয়া বলেন, ছোট চুক্তিগুলো ভূরাজনৈতিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির কারণে বাধাগ্রস্ত হলেও বড় চুক্তিগুলো ঠিকই সফল হচ্ছে। কারণ তার মতে, বড় চুক্তিগুলো হঠাৎ করে হয় না, দীর্ঘ সময় ধরে প্রক্রিয়াধীন থাকে।

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের মেঘ থাকলেও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কৌশলগত সম্প্রসারণ থেকে পিছিয়ে আসছে না। বরং বাজার অস্থিরতাকে পাশ কাটিয়ে বড় ধরনের রূপান্তরমূলক চুক্তির মাধ্যমেই নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে।

আরও